কলমের কান্না কি শুনতে পাও?


আশিকুর রহমান প্রকাশের সময় : আগস্ট ১৫, ২০২৩, ৭:৫১ পূর্বাহ্ণ /
কলমের কান্না কি শুনতে পাও?

আশিকুর রহমান: আমরা হাতের কলমটি দিয়ে প্রতিদিন কত কথা লিখি; সুখ, দুঃখ, হাসি-আনন্দ, কান্না ও বেদনার কথা। কিন্তু আমরা কখনো বুঝতে চাইনা কলমের ও রয়েছে নিজস্ব কিছু কথা, কিছু প্রত্যাশা। আমরা কি কখনো ভাবি সেই কলমের কথা? কিসে কলমের আনন্দ, কিসে কলমের বেদনা?
কলমের যে সাধক, কলম চায় সে তাকে সমাদরে, পরম মমতায় যেন সত্যের পথে পরিচালিত করে। কিন্তু আমরা কলমের সাধকরা কি পারি কলমের যথার্থ মর্যাদা রক্ষা করতে? কোনো লেখক যখন কলমের কথা অনুভব করে ও প্রত্যাশা পূরণ করে কলমের তখন হাসি ফুটে, আনন্দের তরঙ্গ প্রবাহের সৃষ্টি হয়। লেখকের হৃদয়েও যে তখন আনন্দের রেখা বয় তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। কলমের প্রতিটি শব্দ একেকটা ফুল। আর কলমের রেখা তো একেকটা আলোকরেখা। কলমই পারে একটি অন্ধকার জীবনকে আলোর পথে আনতে, পারে সমাজকে সত্যের পথ দেখাতে, পারে ন্যায় ও কল্যাণের পথে অবিচল থাকতে। একটি কথার মূল্য হতে পারে সমাজের জন্য আদর্শস্বরুপ। কলমের দ্বারাই পরিবার, সমাজ তথা দেশের অপসংস্কৃতি রুখতে পারে। সমাজের অন্যায়, অত্যাচার ও দূর্নীতি তুলে ধরে সমাজের গতিধারা পরিবর্তন করতে পারে।
প্রতিটি কলম যোদ্ধা চাইলেই সমাজের পরিবর্তন নিয়ে আসা সম্ভব। তবে কলম যোদ্ধাকে অবশ্যই কলমের যোগ্যতা অর্জনে সত্য প্রতিষ্ঠার লক্ষে কলম অস্ত্র চালাতে হবে। কলমের একটি লেখা জীবনে বিপ্লব সৃষ্টি করতে পারে। পারে সমাজের গভীর অতলে তলিয়ে থাকা কোন জীবন সংগ্রামীর ঘটনা ফুটিয়ে তুলতে। পথশিশুদের বাসস্থানের অভাব, প্রয়োজনীয় শিক্ষার অভাব, শহরের বসবাস অযোগ্য জায়গায় বস্তিবাসীর অসহায়ত্ব। তাদের হাতে কলম তুলে দেয়ার সময়ই তারা খাদ্যের খোঁজে পথে বের হয়। শিক্ষা ও কলমই পারে তাদের উন্নত জীবন দিতে। মৌলিক চাহিদা গুলো যেন তাদের বিলাসিতা। অথচ কলমের ঠোঁটে এই দুর্দশা তুলে ধরে তাদের জীবন মানের উন্নয়ন ঘটানো সম্ভব। দূর্নীতি, দুঃশাসন, সুদ-ঘুষ যেন বর্তমান সমাজ ও রাষ্ট্রে প্রাত্যহিক জীবনের একটা বড় অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে, এসবের বিরুদ্ধেও কলম কথা বলতে পারে। পারে আক্রান্ত সমাজের ফুসফুসকে পয়ঃনিষ্কাশন করে সুস্থ করে তুলতে।
পূর্বযুগে যারা কলমকে সত্য ও ন্যায়ের পথে ব্যবহার করেছেন তারা বর্তমান কলম যোদ্ধাদের জন্য চলার পথে পাথেয় যোগায়। কলমের ঠোঁটে জায়গা করে নেওয়া গল্প, কবিতা কিংবা উপন্যাসের পাতায় সমাজের দুর্দশা ফুটিয়ে তুলতে পারে। সামাজিক দায়বদ্ধতা নিয়ে সাহসিকতার সাথে সত্যকে সত্য এবং মিথ্যাকে মিথ্যা বলার সৎসাহস নিয়ে মানুষকে কল্যাণের পথ দেখাতে পারে। লেখকের লেখায় অন্যায়, অত্যাচার, জুলুম ও মিথ্যাচারের বিরুদ্ধে আওয়াজ ধ্বনিত হয়। এসব লেখার প্রভাবে সমাজে পরিবর্তন ও যুব সমাজের মধ্যে দেশপ্রেম জাগ্রত হয়।
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম তার প্রতিবাদী কবিতা গুলোয় ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন উসকে দিয়েছিলেন: এ দেশ ছাড়বি কিনা বল, নইলে কিলের চোঁটে হাড় করিবো জল। অন্যায়ের সাথে আপোষহীন এই কবি দেশ ও মানুষের চিন্তা করে কলমকে বানিয়েছিলেন অন্যায় ও শোষণের বিরুদ্ধে শাণিত অস্ত্র। সমাজ থেকে কি দুঃখ-বেদনা, কুসংস্কার, অপসংস্কৃতি, শোষণ উঠে গেছে? এসব সমসাময়িক বিষয় তুলে ধরে সমাজের তরুণদের মাঝে প্রতিফলন ঘটাতে পারে। কিন্তু কলম যখন কারো হাতে লাঞ্ছিত, অন্যায় অত্যাচারের অধীন তখন কলম থাকে শিকলবদ্ধ। সেই কলমে সমাজের দুর্দশার প্রতিফলন ঘটেনা। আমরা কেন ভাবিনা কলমের কথা?
কেন কলমের কান্না শুনতে পাইনা আমরা? নাকি বোধগম্য হয়না? প্রতিটি কলমের ঠোঁট নিঃসৃত কালিই যে কলমের বেদনার বহিঃপ্রকাশ তা উপলব্ধি করি কখনো? করিনা। প্রতিটি পৃষ্ঠায়, প্রতিটি শব্দে আমরা তার অপব্যবহারের সাক্ষী রাখছি। যে কালিতে সমাজের দুর্দশার প্রতিফলন ঘটানোর কথা সেই কালিই এখন কান্নার জল। যে কলম সমাজ সংস্কারের অস্ত্র হওয়ার কথা সেই কলম হচ্ছে ব্যবহার্য সামগ্রী মাত্র। কলমের দাম পাঁচ টাকা হলেও এর মূল্য অপরিসীম। কিন্তু আমরা এর মূল্য অনুভব করতে পারিনা, পারিনা কান্নার শব্দ শুনতে। কলম হয়ে আছে চাতকের মতো পিপাসিত, অনাহারী শিশুর মতো ক্ষুধার্ত। কলম চায় সূর্যের মত দেদীপ্যমান হতে, চায় সমাজের উজ্জ্বল অস্ত্র হতে। এই মূল্যহীন কলমের এক সমুদ্র কালি দিয়ে কি সমাজের এক বিন্দু পরিবর্তন সম্ভব? না সম্ভব না। কলমের যখন এই শোচনীয় অবস্থা, যথার্থ ব্যবহার হয়না তখন আমরা কলমের সঠিক চর্চা থেকে পিছিয়ে আছি। লেখকরা সঠিক চর্চা না করলে সমাজ থেকে অন্ধকার দুর হবেনা। দুর হবেনা কলমের কান্না।
আমরা চাইলেই পারি কলমের হাসি-কান্না অনুভব করে কলমের মর্যাদা পুনরুদ্ধার করতে। সমাজকে অন্ধকারাচ্ছন্ন থেকে আলোয় নিয়ে আসা এবং সকল অন্যায়-অত্যাচার, শোষণ, নির্যাতন, গুম, খুনসহ সকল সমসাময়িক বিষয় গুলোর দর্পণ হিসেবে ব্যবহার করতে। হে লেখক! এখনই সময় কলমের কান্না অনুভব করার, কলমকে কাজে লাগানোর, সময় কলমকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে শাণিত করার। লেখকের লেখনীতে কলম হয়ে উঠুক সমাজের আয়না।

 

প্রকাশিত: দৈনিক জনতা
প্রকাশকাল: ০২ জুলাই, ২০২২
লিংক: https://shorturl.at/uJNOQ

FB IMG 1692063910930