দক্ষ তরুণরাই আগামীর সম্পদ


আবু তালহা আকাশ প্রকাশের সময় : আগস্ট ১৪, ২০২৩, ১০:১৭ অপরাহ্ণ /
দক্ষ তরুণরাই আগামীর সম্পদ
আবু তালহা আকাশ 
‘মোরা ঝঞ্ঝার মতো উদ্যম, মোরা ঝর্ণার মতো চঞ্চল, মোরা বিধাতার মতো নির্ভয়, মোরা প্রকৃতির মতো সচ্ছল।’ তরুণদের উদ্দেশ্য করে কথা গুলো বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম এর। তারুণ্য মানেই শক্তি, তারুণ্য মানেই অসাধ্যকে সাধন করে জয়ের হাতছানি। তারুণ্য মানে না কোনো বাঁধা, মানে না কোনো সংশয়। প্রতিটি মূহুর্ত অসম্ভবকে সম্ভব করে চলেছে তরুণরা। পৃথিবীর ইতিহাসের যত বড় বড় অর্জন সবকিছুর পেছনের মূল শক্তি হিসেবে কাজ করেছে এই তরুণ প্রজন্ম। তাইতো কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের ভাষায়, ‘আঠারো বছর বয়সের নেই ভয়; পদাঘাতে চায় ভাঙতে পাথর বাঁধা, এ বয়সে কেউ মাথা নোয়াবার নয়- আঠারো বছর বয়স জানে না কাঁদা’।

বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার উল্লেখযোগ্য সংখ্যক তরুণ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো’র তথ্য মতে ২০২১ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত দেশে মোট জনসংখ্যা ১৬ কোটি ৯১ লাখ ১ হাজার এবং এই বিশাল জনগোষ্ঠীর ৫৩.৭ শতাংশ তরুণ। এটি আমাদের দেশের জন্য বিরাট এক সম্ভাবনাময় বিষয়। সুবিশাল এই জনগোষ্ঠীকে যদি আমরা পরিপূর্ণ নির্দেশনা, সুযোগ-সুবিধা ও প্রশিক্ষণ প্রদানের মাধ্যমে জনশক্তিতে রূপান্তরিত করতে পারি তাহলে অপার সম্ভবনার দ্বার খুলে দেবে বিরাট এই জনগোষ্ঠী। আমাদের ৫২’র ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে মহান স্বাধীনতা যুদ্ধ পুরোটা জুড়েই ছিল এই তরুণদের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ। তরুণদের হাতধরেই দেশের যেকোনো অন্যায়, অসংগতি দূর হয়ে আসছে। যুগ-যুগ ধরে তাইতো দেশের যেকোনো সমস্যা কিংবা দূর্যোগে তরুণদেরকেই আমরা সর্বপ্রথম এগিয়ে আসতে দেখি। সম্প্রতি দেশে স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যার মুখোমুখি হয়েছে সিলেটবাসী। সেখানেও আমরা দেখেছি স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে সার্বক্ষণিক সেবা দিয়েছে এই তরুণরা।

তারুন্যই একটি দেশের প্রাণ শক্তি। যার হাত ধরে এগিয়ে যায় একটি দেশের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি। আর তাই এই সম্ভাবনাময় গোষ্ঠীকে ব্যবহারিক শিক্ষায় শিক্ষিত করে জনসম্পদে রুপান্তর করাই আমাদের একমাত্র লক্ষ্য হওয়া উচিত। সর্বশেষ ২০২১ সালের প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে সাক্ষরতার হার ৭৫.৬ শতাংশ। যা ১৯৭১ সালে ছিল মাত্র ১৬.৮ ভাগ। এতে দেখা যাচ্ছে স্বাধীনতার ৫০ বছরে ৫৮.৮ শতাংশ মানুষ অক্ষর জ্ঞান সম্পন্ন হয়েছে। এ বিরাট অর্জন সম্ভব হলেও কেন আজ দেশে বেকারের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে? আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) আঞ্চলিক কর্মসংস্থান নিয়ে এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের উচ্চশিক্ষিতদের মধ্যে বেকারত্বের হার বাংলাদেশে ১০.৭ শতাংশ, যা এ অঞ্চলের ২৮টি দেশের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। আমাদের তরুণ জনগোষ্ঠীকে জনসম্পদে পরিণত করতে তাই পুঁথিগত শিক্ষার ভেতর থেকে বের হয়ে কারিগরি বা ব্যবহারিক শিক্ষায় শিক্ষিত করে গড়ে তুলতে হবে। তরুণদের মাঝে সরকারি চাকুরী কিংবা বিসিএস প্রবণতা থেকে বের হয়ে উদ্দোক্তা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে। সম্প্রতি দেশের ৪৪ তম বিসিএস এর পরীক্ষার্থীর সংখ্যা ৫৪ টি দেশের জনসংখ্যার চেয়ে বেশি! এটি একটি জাতির জন্য বিরাট হুমকি স্বরূপ। যেখানে আজ ডাক্তার,ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে পড়াশোনা করে তাদের সেই বিষয়ে দক্ষ ডাক্তার কিংবা ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার কথা; কিন্তু দুঃখজনক বিষয় তারা বিসিএস পরিক্ষা দিয়ে বিভিন্ন ক্যাডারে যুক্ত হচ্ছে! এর জন্য মূলত দায়ী এসব তরুণরা নয়, নেপথ্য কারণ হচ্ছে বাস্তবতা তাদের সেদিকে ঠেলে দিচ্ছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর জরিপ মতে, প্রতি বছর দেশের কর্ম বাজারে প্রবেশ করেছে প্রায় ২৭ লাখ মানুষ। যার থেকে খুব কম সংখ্যক তরুণদের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। সংবাদ মাধ্যমের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রতি ১০০ স্নাতক ডিগ্রিধারী তরুণ-তরুণীর মধ্যে ৪৭ জনই বেকার! দেশের মোট বেকারের শতকরা ৭৪ ভাগই এই তরুণ-তরুণী!
তাই এ থেকে উত্তরণের জন্য প্রাথমিক থেকে স্নাতক পর্যন্ত শিক্ষাকে একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় যুগোপযোগী করতে কারিগরি শিক্ষা, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি খাতে অধিকতর বিনিয়োগ বৃদ্ধি করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণার জন্য আর্থিক ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি করতে হবে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি খাতকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। দেশের প্রতিটি উপজেলায় সমাজসেবা অধিদপ্তর ও  যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর যে-ধরনের কার্যক্রম পরিচালনা করছে তাতে আরো বেশি বিষয় যুক্ত করতে হবে। যাতে করে তরুণরা আত্মনির্ভরশীল হয়ে জীবিকা নির্বাহ করতে পারে। একটি চাকরির জন্য যেন তাদের ঘুরতে না হয়। ক্যারিয়ারকেন্দ্রিক মানসিক ও সামাজিক চাপ এবং ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার কারণে তরুণ-তরুনীদের মাঝে আত্মহত্যার প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে। সর্বশেষ আত্মহত্যা নিয়ে ২০২১ আঁচল ফাউন্ডেশনের এক হিসাব অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি আত্মহত্যা করেছে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। আত্মহত্যা করা ১০১ জনের মধ্যে ৬২ জন বা ৬১.৩৯ শতাংশই পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। একই সাথে মেডিকেল কলেজ ও অনার্স কলেজের ১২ জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করে, যা মোট আত্মহত্যাকারীর ১১.৮৮ শতাংশ। এর মধ্যে ইঞ্জিনিয়ারিং বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪ জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার হার ২২.৭৭ শতাংশ, যা সংখ্যায় ২৩।
তবে হতাশার কথা আমাদের সামজিক ও রাষ্ট্রীয় অনেক সমস্যা থাকলেও তরুণ সমাজের মাঝে নতুন কিছু করা কিংবা তাদের যে উদ্ভাবনে চিন্তা শক্তি এগুলো দিনে দিনে লোপ পাচ্ছে। আজ আমাদের যুবসমাজ যেখানে ব্যস্ত থাকার কথা সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট, আইটি সেক্টর সহ নানা রকম গবেষণা মূলক কাজে নিজেদের দক্ষতা বৃদ্ধিতে। সেখানে আমাদের তরুণরা ঘন্টার পর ঘন্টা ফেসবুক, ম্যাসেঞ্জারে চ্যাট করে কাটাচ্ছে, বিভিন্ন রকম ভিডিও গেম নিয়ে তারা ব্যস্ত। এছাড়াও মাদক হয়ে উঠেছে বিশালাকৃতির হুমকি স্বরূপ। তরুণ প্রজন্মের একটা বড় অংশ আজ মাদকের দিকে ঝুঁকে পড়ছে। এই মাদকের দ্বারা যে শুধুমাত্র সে ব্যক্তি, তার পরিবার কিংবা সমাজ হুমকির মুখে পতিত হচ্ছে তা কিন্তু না, সামগ্রিকভাবে পুরো জাতি ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে।
বেকারত্ব, হতাশা, মাদক আত্মহত্যা সহ যাবতীয় সমস্যাবলী থেকে মুক্ত রাখতে, পুরো জাতিকে একটি উন্নয়নশীল দেশ তথা মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের শহীদ ও জাতির পিতার স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ে তুলতে আমাদের এই তরুণ প্রজন্মকে বিশ্বমানের মানব সম্পদ হিসেবে গড়ে তোলার কোনো বিকল্প নাই। এজন্য তাদের যথোপযুক্ত সুযোগ-সুবিধা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে গড়ে তোলার মাধ্যমেই কেবল একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেজ মোকাবিলা করতে সক্ষম হবো। আর এই দক্ষ তরুণরাই হবে আমাদের আগামীর সম্পদ।
পত্রিকা: বাংলাদেশের খবর
প্রকাশকাল: ২২ আগস্ট, ২০২২